অলিভ অয়েল তেলের বিভিন্ন উপকারিতা, খাওয়া ও ব্যবহারের নিয়ম

বিভিন্ন পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ অলিভ অয়েল বা জলপাই তেল সাধারণত রান্না, সালাদ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। খাওয়ার পাশাপাশি বর্তমান সময়ে ত্বক ও চুলের যত্নে অলিভ অয়েলের কদর বেড়েছে। প্রিয় পাঠক আজকের লেখাজুড়ে আমি আপনাদের সাথে আলোচনা করবো অলিভ অয়েল কি, প্রকারভেদ, এর পুষ্টিগুণ, স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং এর পাশাপাশি ত্বক ও চুলের যত্নে জলপাই তেল কিভাবে সাহায্য করতে পারে সে বিষয়ে বিস্তারিত।

অলিভ অয়েল কি?

ইংরেজি অলিভ শব্দের বাংলা অর্থ জলপাই এবং অয়লে অর্থ তেল। অলিভ অয়েল হচ্ছে জলাপাই তেল। সহজ ভাষায় বলতে জলাপাই চেপে বা পিষে যে তেল পাওয়া যাক তাকে অলিভ অয়লে বলে।

অলিভ অয়েলের পুষ্টিগুণ

১০০ মিলি অলিভ অয়েল আমদের ৮৮৪ ক্যালোরি শক্তি সরবরাহ করে। এটি মনোস্যাচুরেটেড সমৃদ্ধ এবং পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। যাতে ৭০ শতাংশ অলিক অ্যাসিড রয়েছে। এছাড়াও জলপাই তেলে রয়েছে পলিফেনল, টোকোফেরল, ফাইতোস্টেরল, স্কোয়ালিন, টেরপেনিক অ্যাসিডসহ বেশ কয়েকটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এতে ভিটামিন ই, এবং ভিটামিন কেও রয়েছে।

অলিভ অয়েলের প্রকারভেদ

অলিভ অয়েলকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যাথা- এক্সট্রা ভারজিন, ভারজিন এবং পরিশোধিত। এদের মধ্যে রিফাইন্ড বা পরিশোধিত অলিভ অয়েল সবচেয়ে বেশি প্রক্রিয়াজাত করা হয়।

অলিভ অয়েল বা জলপাই তেলের স্বাস্থ্য উপকারিতা

প্রিয় পাঠক চলুন এ পর্যায়ে জলপাই তেলের বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক-

স্বাস্থ্যকর মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট সমৃদ্ধ

জলপাই থেকে নিঃসৃত তেলের প্রধান ফ্যাটি অ্যাসিড হল একটি মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট যা অলিক অ্যাসিড নামে পরিচিত। অলিভ অয়েলের মনোস্যাচুরেটেড অলিক অ্যাসিডের অনেক উপকারী প্রভাব রয়েছে। একাদিক গবেষণায় দেখা গেছে অলিক অ্যাসিড শরীরের প্রদাহ কমায় এবং এমনকি ক্যান্সারের সাথে যুক্ত জিনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়

অলিভ অয়েলে থাকা পলিফেনল আমাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীতে কলেস্টেরল জমা প্রতিরোধ করা হয়। এতে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। অনেক বিশেষজ্ঞ দাবি করেন দৈনন্দিন রেসিপিতে অলিভ অয়েল যোগ করলে স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা ৪০% এর বেশি কমে যেতে পারে।

হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি করে

আপনার নিয়মিত ডায়েটে এক্সট্রা ভার্জিন তেল আপনার হৃদরোগ বা হার্টের রোগের ঝুকি কমাতে সাহায্য করবে। Atherosclerosis হচ্ছে ধমনীর চারপাশে চর্বি, কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য পদার্থ জমা হওয়া। একে প্লেক বলা হয়। এর ফলে আমাদের ধমনী সংকীর্ণ হয়ে যেতে পারে এবং রক্ত প্রবাহ বাঁধাগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে। অলিভ অয়েলে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্লেক উৎপাদন হ্রাস করে। নিয়মিত জলপাই তেল খাওয়া এলডিএল কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করতে পারে। ২০২১ সালে সাইন্স ডিরেক্ট এ প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা যায় যারা প্রতিদিন হাফ টেবিল চামচ Olive Oil খায় তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি, যারা জলপাই তেল খায় না তাদের তুলনায় ১৪% কম।

স্কিনের যত্নে অলিভ অয়েলের ব্যবহার

প্রিয় পাঠক, চলুন এ পর্যায়ে স্কিন বা ত্বকের যত্নে অলিভ অয়েল বা জলপাই তেলের উপকারিতা ও ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক-

ত্বকের আদ্রতা রক্ষা করে

আপনি হয়তো জেনে থাকবেন আমাদের স্কিনে পানির পরিমাণ কমে গেলে আমাদের স্কিনে রুক্ষ ভাব চলে আসে। ইন্টারন্যাশনাল অলিভ কাউন্সিলের মতে, জলপাই তেলে রয়েছে ভিটামিন এ, ই, ডি ও কে।এই সকল ভিটামিন উপাদানগুলো আমাদের স্কিনের সংবেদনশীল অংশকে সুরক্ষা প্রদান করে।

বয়সের ছাপ দূর করে

আমাদের বয়সের সাথে সাথে মুখ ও শরীরে ছাপ পড়তে শুরু করে। তবে অনেকেরই অল্প বয়সেই মানসিক চাপ, দূষিত পরিবেশ ও অন্যান্য কারনে বয়সের ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। অলিভ অয়েলে থাকা পলিফেনল নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বয়স হওয়ার জন্য দায়ী ফ্রি র‍্যাডিকেল তৈরি হতে দেয় না, পাশাপাশি সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকেও আমাদের মুখের ত্বককে রক্ষা করে।

স্কিন পরিষ্কার করতে

আমরা আমাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বা সাজগোজের জন্য বিভিন্ন ধরণের মেকআপ ব্যবহার করে থাকি। তবে নির্দিষ্ট সময় পর এগুলো তুলে ফেলতে হয় ও মুখ পরিষ্কার করতে হয়। মুখ থেকে মেকআপ দুর করার জন্য বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহার করা হয়ে থাকে যাতে নানা রাসায়নিক ব্যবহার করে যার ফলে স্কিনে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মেকআপ দূর করার প্যাডে বা সরাসরি Olive Oil ব্যবহার করে মেকআপ দূর করলে স্কিনে কোন প্রকার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

চুলের যত্নে অলিভ অয়েল

প্রিয় পাঠক, এ পর্যায়ে চলুন চুলের যত্নে জলপাই তেলের ব্যবহারের বিভিন্ন উপকারিতা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক-

ডিপ কন্ডিশনার

অলিভ অয়েল একটি চমৎকার প্রাকৃতিক কন্ডিশনার। এটি চুলের স্যাফটে প্রবেশ করতে পারে, ময়েশ্চারাইজ করতে পারে এবং ক্ষতিগ্রস্থ ও শুষ্ক চুলকে পুষ্ট করতে পারে।

খুশকির সমস্যা দূর করে

অলিভ অয়েলে রয়েছে অ্যান্টি ফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য যা কিনা একটি প্রাকৃতিক কন্ডিশনার হিসেবে কাজ করে। মাথার ত্বকে খুশকি ও শুষ্কতা দূর করতেও দারুন কাজ করে। এছাড়াও খুশকির কারনে জ্বালাভাব এবং চুলকানি থেকেও মুক্ত রাখতে সাহায্য করে।

চুলের বৃদ্ধি করে

নিয়মিত জলপাই তেল মালিশ করলে রক্ত প্রবাহ উদ্দীপ্ত হয় এবং এটি চুলের বৃদ্ধিতে ভুমিকা পালন করে। পাশাপাশি চুল মসৃণ এবং চকচকে করে।

অলিভ অয়েল বা জলপাই তেল খাওয়ার নিয়ম

তরকারি রান্না কিংবা ভাঁজা, সালাদ তৈরি করতে, মাংস গ্রিল করতে, বেকিং ইত্যাদি উপায়ে অলিভ অয়েল খাওয়া যায়।

স্কিনের যত্নে অলিভ অয়েল বা জলপাই তেল ব্যবহারের নিয়ম

অলিভ অয়েল ও মধু

১ টেবিল চামচ মধু, ১ টেবিল চামচ অলিভ অয়েল এবং ১ টি ডিমের কুসুম নিন। একটি পাত্রে সবগুলো উপাদান নিন এবং একটি মিশ্রণ তৈরি করুন। এই মিশ্রণটি আপনার মুখের স্কিনে লাগান এবং ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর কুসুম গরম পানি দিয়ে আপনার মুখ ধুয়ে ফেলুন। ভালো ফল পেতে সপ্তাহে দুইবার ব্যবহার করুন।

হলুদ ও অলিভ অয়েল

১ টেবিল চামচ জলপাই তেল, হাফ চা চামচ হলুদ গুঁড়া এবং ২ টেবিল চামচ দই নিন। একটি পাত্রে বা বাটিতে সবগুলো উপকরণ নিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন। মিশ্রণটি আপনার মুখে লাগান। অলিভ অয়েল, হলুদ এবং দইয়ের মিশ্রণটি মুখে লাগিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনটি অপেক্ষা করুন। এরপর পানি দিয়ে আপনার মুখ ভালো করে পরিষ্কার করে ফেলুন। মুখ থেকে হ্লুদের দাগ দূর করতে ফেসিয়াল ক্লিনজারও ব্যবহার করতে পারেন।

চুলের যত্নে অলিভ অয়েল বা জলপাই তেল ব্যবহারের নিয়ম

আপনার চুল যদি শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে থাকে তবে একটি প্যানে পরিমাণ মতো অলিভ অয়েল বা জলপাই তেল নিন এবং সামান্য গরম করুন। তেল গরম হলে হাতে নিয়ে আঙ্গুলের ডগা দিয়ে আলতো করে ম্যাসাজ করুন। এরপর ১০-১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন এবং শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। শ্যাম্পু শেষ কন্ডিশনার ব্যবহার করুন। (যে পাত্রে তেল গরম করছেন সেটিতে যেন মরিচ বা ঝাল না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন কারণ রান্নার পাত্রে তেল গরম করলে মাথায় জ্বালাপোড়া হতে পারে)

কন্ডিশনার হিসেবে

কন্ডিশনার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলে আপনার পরিষ্কার চুলের আগা থেকে গোঁড়া পর্যন্ত ভালো করে জলপাই তেল লাগিয়ে নিন। এরপর একটি তোয়াল নিয়ে হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে নিংরে নিন এবং এই তোয়ালেটি আপনার মাথায় ২০-৩০ মিনিট মুড়িয়ে রাখুন। (আপনার ঠাণ্ডা জনিত সমস্যা থাকলে এই পদ্ধতি এড়িয়ে চলা উত্তম)

হেয়ার মাস্ক হিসেবে অলিভ

হেয়ার মাস্ক হিসেবেও Olive Oil বা জলপাই তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি কাপ বা বাটিতে ডিমের সাদা অংশ নিন এবং এর মধ্যে এক টেবিল চামচ অলিভ অয়েল যোগ করুন। এরপর অলিভ অয়েল এবং ডিমের সাদা অংশ ভালোভাবে মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন। এই মিশ্রণটি মাথার ত্বক থেকে চুলের আগা পর্যন্ত ভালো করে লাগিয়ে নিন। ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন এবং সাধারণ পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

অলিভ অয়েলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অপকারিতা

অলিভ অয়েল খাওয়া নিঃসন্দেহে একটি দারুন কাজ এর কোন অপকারিতা নেই। তবে নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস না থাকলে বা হঠাৎ খাওয়া শুরু করলে বমি বমি বোধ করতে পারে।

সর্বশেষ

প্রিয় পাঠক, অলিভ অয়েল বা জলপাই তেলের উপকারিতা ও ব্যবহার সম্পর্কে আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। আমাদের লেখা নিয়ে আপনাদের কোন প্রশ্ন, মতামত থাকলে লিখেতে পারেন আমাদের কাছে।

আরও পড়ুনঃ তালমাখনার উপকারিতা

Scroll to Top