১০টি উচ্চ আমিষ বা প্রোটিন জাতীয় খাবারের তালিকা

আমাদের শরীরের জন্য অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান হচ্ছে আমিষ। বিভিন্ন ধরণের প্রাণীজ ও উদ্ভিজ্জ উপাদান থেকে আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় আমিষের চাহিদা মেটানো সম্ভব। প্রিয় পাঠক আজকের লেখাজুড়ে আমি আপনাদের সাথে আলোচনা করবো- আমিষ কি, বয়স ও লিঙ্গ অনুসারে প্রতিদিন একজন মানুষের কি পরিমান আমিষ বা প্রোটিন গ্রহণ করা উচিত, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারের তালিকা।

আমিষ (Protien) কি?

সহজ ভাষায় প্রোটিন বা আমিষ হল একটি পুষ্টি উপদান যা আপনার শরীরের কোষ বৃদ্ধি ও মেরামত এবং সঠিকভাবে কাজ করার জন্য প্রয়োজন। এটি শরীরের কোষে বেশিরভাগ কাজ করে এবং অঙ্গগুলির গঠন, কার্যকরীতা এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয়। প্রোটিন শুধু আপনার স্বাস্থ্যের জন্যই অপরিহার্য না, এটি গ্রহনে আপনি পূর্ণ এবং সন্তুষ্ট বোধ করতে পারেন, পাশাপাশি এটির উপর স্বাস্থ্যকর শরীরের ওজনও নির্ভর করে।

একজন মানুষের কি পরিমান প্রোটিন গ্রহন করা উচিত

একজন মানুষের প্রদিন কি পরিমান প্রোটিন প্রয়োজন সেটি নির্ভর করে তার উচ্চতা, লিঙ্গ, বয়স এবং স্বাস্থ্যের উপর। পুষ্টিবিদদের মতে ১ থেকে ৩ বছরের শিশুদের ১৩ গ্রাম, ৪ থেকে ৯ বছরের শিশুদের প্রতিদিন ১৯ গ্রাম, ৯ থেকে ১৩ বছর বয়সী শিশুদের ৩৪ গ্রাম, ১৪ থেকে ১৮ বয়সী কিশোরদের লিঙ্গ অনুসারে ভিন্ন হয়ে থাকেঃ ছেলের জন্য সাধারণত ৫২ গ্রাম এবং মেয়েদের জন্য প্রায় ৪৬ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। ১৯ বছরের উপরের বা প্রাপ্ত বয়স্কদের ৫৬ গ্রাম প্রোটিন গ্রহন করা উচিত। গর্ভবতীদের জন্য এর পরিমান আরও বেশি, প্রায় ৬০ গ্রাম।

বয়স ভেদে দৈনিক প্রয়োজনীয় আমিষের পরিমাণ

নিচে বয়স অনুসারে ছেলে ও মেয়েদের প্রয়োজনীয় প্রোটিনের পরিমানের তালিকা দেওয়া হলঃ

বয়সপ্রোটিনের পরিমান
১ থেকে ৩ বছর১৩ গ্রাম
৪ থেকে ৮ বছর৩৪ গ্রাম
১৪ থেকে ১৮ বছর (ছেলে)৫২ গ্রাম
১৪ থেকে ১৮ বছর (মেয়ে) ৪৬ গ্রাম
১৯ থেকে ৭০ বছর+ (পুরুষ) ৫৬ গ্রাম
১৯ থেকে ৭০ বছর (মহিলা) ৪৬ গ্রাম
List of daily requirement of protein by age

আমিষের উৎস

আমিষের উৎসকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- ১) প্রাণীজ এবং ২) উদ্ভিজ্জ। চলুন জেনে নেওয়া যাক কোন কোন খাবারে প্রোটিন রয়েছে। আমিষের প্রধান উৎসগুলো নিচে দেওয়া হলো-

  • চর্বিহীন মাংস – গরুর মাংস, ভেড়ার মাংস, মহিষের মাংস, শূয়রের মাংস, ক্যাঙ্গারু।
  • পোলট্রি – ডিম, মুরগি, টার্কি, হাঁস, পাখি
  • মাছ এবং সামুদ্রিক খাবার – মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, গলদা চিংড়ি, ঝিনুক, স্ক্যালপস।
  • দুগ্ধজাত পন্য – দুধ, দই, পনির।
  • বাদাম এবং বীজ – বাদাম, পাইন বাদাম, আখরোট, কাজু বাদাম, কুমড়ার বীজ, সূর্যমুখী বীজ, তিলের বীজ।
  • শিম এবং মটরশুঁটি- সমস্ত প্রকার মটরশুঁটি, মসুর ডাল, ছোলা, তোফু।

১০ টি হাই-প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার

নিচে ১০ টি হাই-প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারের নাম ও এতে কি পরিমান প্রোটিন রয়েছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হলঃ

ডিম

ডিমকে প্রাণীজ আমিষের অন্যতম একটি সেরা উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ডিমের সাদা অংশের পুরোটাই প্রায় বিশুদ্ধ প্রোটিন। তবে কুসুম অন্তর্ভুক্ত পুরো ডিম খনিজ, ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি সহ আরও অনেক পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। একটি বড় আকারের (৫০ গ্রাম) ডিমে প্রায় ৬.৩ গ্রাম আমিষ থাকে।

চিকেন ব্রেস্ট

আমাদের অনেকেই মুরগির মাংস খেতে অনেক পছন্দ করে। আর তাদের বেশিরভাগই রানের মাংস পছন্দ করে। তবে আপনি অবাক হবেন যে রানের তুলনায় চিকেন ব্রেস্ট বা মুরগির বুকের মাংসে তুলনামূলক বেশি পরিমান আমিষ রয়েছে। পাশাপাশি এতে রয়েছে ভিটামিন বি এবং জিংক ও সেলেনিয়ামের মতো খনিজ উপাদান। প্রতি ৮৬ গ্রাম মুরগির বুকের মাংস থেকে প্রায় ২৬.৭ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়।

কাজুবাদাম

কাজুবাদামকে অনেকে সুপারফুডের তালিকায়ও স্থান দিয়ে থাকেন। উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের অন্যতম উৎস এটি। কাজুবাদামে রয়েছে ফাইবার, ভিটামিন ই, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেসিয়ামর মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। প্রতি ২৮.৩৫ গ্রাম কাজুবাদামে প্রায় ৬ গ্রাম পরিমান আমিষ থাকে।

কটেজ পনির

কটেজ পনির হচ্ছে এক ধরনের পরিন যাতে চর্বি কম এবং ক্যালোরি থাকে তবে তুলনামূলক বেশি প্রোটিন বা আমিষ থাকে। পাশাপাশি কটেজ পনিরে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ফস্ফরাস, সেলেনিয়াম, ভিটামিন বি ১২, রিবোফ্লাভিন বা ভিটামিন বি ২ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। এক কাপ বা ২২৬ গ্রাম কটেজ পনিরে প্রায় ২৮ গ্রাম আমিষ পাওয়া যায়।

দুধ

উচ্চমানের প্রোটিনের জন্য দুধ অন্যতম একটি উৎস। পাশাপাশি এতে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি২, ফসফরাস ও অন্যান্য খনিজ উপাদান। তবে অনেক লোক আছে যারা দুধের ঘ্রান সহ্য করতে পারে না। গবেষণায় দেখা যায় যে, ১ কাপ বা ২৪৬ মিলি দুধে প্রায় ৮.৩২ গ্রাম আমিষ পাওয়া যায়।

চর্বিহীন গরুর মাংস

চর্বিহীন গরুর মাংস আমিষের একটি অন্যতম উৎস। এছাড়াও এতে আয়রন, দস্তা, সেলেনিয়াম, এবং ভিটামিন বি ১২ ও ভিটামিন বি ৬ রয়েছে। তবে বেশি পরিমান লাল মাংস খাওয়া কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুকি বাড়ায়।

মসুর ডাল

উদ্ভিজ্জ আমিষের সবচেয়ে সমৃদ্ধ উৎস হচ্ছে মসুর ডাল। আপনি যদি একজন প্রাণীজ নিরামিষ ভোজী হয়ে থাকেন তবে মুসুর ডাল হতে পারে একটি দুর্দান্ত সমাধান। আমিষের পাশাপাশি মুসুর ডালে রয়েছে ফাইবার, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, তামা ও ম্যাঙ্গানিজ সহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান। এক বিশেষ গবেষণায় দেখা যায় যারা নিয়মিত মসুর ডাল খায় তাদের হৃদরোগের এবং ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুকি তুলনামূলক কম থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম মসুর ডালে প্রায় ৯.০২ গ্রাম প্রোটিন থাকে।

মাছ

আধুনিক সমাজের অনেক যুবক যুবতীই মাছ খেতে অনীহা দেখায়। মাছে ভাতে বাঙালি এই কথাটা তারা প্রায় ভুলে যেতেই বসেছে। শিকড় বিচ্যুত এই ছেলে মেয়ে দেখলে আফসোস লাগে। মাছ আমিষের একটি অন্যতম শক্তিশালী উৎস। পাশাপাশি আয়োডিন, সেলেনিয়াম, ভিটামিন ভি ১২ এর মতো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে যারা খাদ্য তালিকায় নিয়মিত মাছ রাখেন তাদের হৃদরোগ এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুকি তুলনামূলক কম থাকে।

প্রায় সকল প্রকার মাছেই আমিষ রয়েছে। প্রতি ৪ আউন্স টুনা মাছের ৩৩ গ্রাম প্রোটিন এবং ২২৫ ক্যালরি পাওয়া যায়, প্রতি ৪ আউন্স তেলাপিয়া মাছে ২৯ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়।

চিনাবাদাম এবং চিনাবাদামের মাখন

চিনাবাদাম এবং চিনাবাদাম মাখন প্রোটিন, ফোলেট, ম্যাগনেসিয়াম এবং ভিটামিন ই এর মতো পুষ্টিতে ভরপুর।
এক আউন্স বা ২৮.৩৫ গ্রাম চিনাবাদামে প্রায় ৭.৩১ গ্রাম পরিমান প্রোটিন পাওয়া যায় এবং এক টেবিল চামচ বা ৩২ গ্রাম মসৃণ চিনাবাদামের মাখনে প্রায় ৭.২ গ্রাম আমিষ পাওয়া যায়।

কুমড়োর বীজ

আমরা অনেকেই কুমড়ো রান্নার সময় এর বীজ ফেলে দেই বিশেষ করে মিষ্টি কুমড়োরর বীজ। কিন্তু অবাক করার বিষয় হচ্ছে এই মিষ্টি কুমড়োর বীজ আয়রন, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম এবং জিঙ্কের মতো খনিজ উপাদান দিয়ে ভরপুর। সালাদ, বেকড পন্য, ওটমিল বা দইতে কুমড়োর বীজ যোগ করে খেতে পারেন।
এক কাপ পরিমান বা ২৯.৫ গ্রাম কুমড়োর বীজে প্রায় ৪.৪ গ্রাম প্রোটিন সরবরাহ করে। এছাড়াও সূর্যমুখী বীজ, শণের বীজ খাওয়া যেতে পারে।

সর্বশেষ

প্রিয় পাঠক আমাদের লেখাটি আপনাদের কাছে কেমন লেগেছে জানিয়ে লিখতে পারেন আমাদের কাছে। আমিষ সমৃদ্ধ খাবার ও কোন বয়সে কি পরিমান আমিষ বা প্রোটিন গ্রহণ করা উচিত আশা করছি সে বিষয়ে বিস্তারিত ধারনা পেয়ে গেছেন। পুষ্টিকর ও নিয়ম মাফিক খাবার গ্রহণ করুন এবং সুস্থ্য থাকুন।

Scroll to Top