ওটস কি, এর উপকারিতা, পুষ্টিগুণ, খাওয়ার নিয়ম, রেসিপি, দাম

বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও খনিজ উপাদানের ভরপুর থাকার কারনে অনেক পুষ্টিবিদ ওটসকে প্রথম শ্রেণীর পুষ্টিকর খাবারের তালিকায় স্থান দিয়েছেন। ওটস যদিও আমাদের দেশীয় খাবার নয়। তবে বিভিন্ন পুষ্টিগুণ থাকায় বাংলাদেশের মানুষের কাছেও ওটমিল দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

প্রিয় পাঠক, আজকের লেখাজুড়ে আমি আপনাদের সাথে আলোচনা করবো ওটস কি, এর পুষ্টিগুণ, খাওয়ার উপকারিতা ও নিয়ম, বাংলাদেশের বাজারে ওটস এর দাম, ওটসের রেসিপি।

ওটস কি

ওটস এর বাংলা অর্থ জই। ওটস (Oats) হল এক ধরণের খাদ্যশস্য যা সাধারণত সকালের নাস্তায় ওটমিল হিসেবে খাওয়া হয়। এটি অনানুষ্ঠানিকভাবে অ্যাভেনা স্যাটিভা নামে পরিচিত। এটি পোয়েসি ঘাস পরিবারের এক ধরণের দানাদার শস্য।

ওটসের পুষ্টিগুণ

আধা কাপ বা ৪০.৫ গ্রাম শুকনো ওটসে রয়েছে দৈনিক চাহিদার ৬৩.৯১% ম্যাঙ্গানিজ, ১৩.৩% ফসফরাস, ১৩.৩% ম্যাগনেসিয়াম, ১৭.৬% তামা, ৯.৪% আয়রন, ১৩.৪% দস্তা, ৩.২৪% ফোলেট, ১৫.৫% ভিটামিন -বি (থায়ামিন), ৯.০৭% ভিটামিন বি৫, অল্প পরিমানে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি৩।
ওটস কার্বোহাইড্রেট এবং ফাইবার সমৃদ্ধ তবে অন্যান্য শস্যের তুলনায় প্রোটিন এবং চর্বিও বেশি।

ওটস খাওয়ার উপকারিতা

প্রিয় পাঠক চলুন এ পর্যায়ে ওটস এর বিভিন্ন উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক-

অন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতি

বিটা গ্লুকান দ্রবণীয় ফাইবার নিয়মিত অন্ত্র খালি করতে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সাহায্য করে। তাই যারা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভুগছেন তারা তাদের খাদ্য তালিকায় Oats যোগ করতে পারেন।
উচ্চরক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে

ওটমিলে রয়েহে উচ্চ মাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। পাশাপাশি এটি রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। আর এর ফলে আমাদের হৃদপিণ্ড তার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।

ওজন নিয়ন্ত্রনে সাহায্য করে

ওটমিল একটি ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার হওয়ার কারনে দীর্ঘ সময় খিদে অনুভব হয় না। কারণ কার্বোহাইড্রেট হজম করতে তুলনামূলক সময় বেশি লাগে। এটি খাওয়ার পর প্রায় ৪ ঘণ্টা খাওয়ার ইচ্ছা তুলনামূলক কম অনুভব হয়।

ডায়াবেটিস

ওটসে থাকা ফাইবার ডায়াবেটিস রগির জন্যও উপকারী। কারণ Oats রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যাদের স্থূলতা আছে না টাইপ ২ ডায়াবেটিস আছে।

কোলন ও স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করে

ওটসে থাকা ফাইটো নিউট্রিয়নেট এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আমাদের শরীরে স্তন ও কোলন ক্যান্সারের মতো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে সকল নারীরা তাদের নিয়মিত খাদ্য তালিকায় ওটস রেখেছেন তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় ৪০% পর্যন্ত কম। পাশাপাশি ওটসে থাকা পুষ্টি উপাদান গুলো আমাদের পাকস্থলী এবং ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্র সুস্থ রাখতে সাহায্য করে আর এর ফলে কোন ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।

ত্বকের স্বাস্থ্যের উন্নতি

আপনি জেনে অবাক হবেন যে, ওটস আমাদের ত্বকের জন্যও ভীষণ উপকারী। কারণ এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং পুষ্টি উপাদান আমাদের ত্বককে আরও বেশি কোমল ও সুন্দর করে তোলে।

ওটস এর অপকারিতা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

অত্যান্ত পুষ্টিকর খাবার হওয়ার পরও ওটস কিছু কিছু সময় উপকারের বদলের ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। অতিরিক্ত ওটমিল খাওয়ার অপকারিতা সমূহ নিচে দেওয়া হল-

অতিরিক্ত ওটমিল খাওয়ার ফএল অতিরিক্ত ঘুম, মাইগ্রেনের ব্যাথা, হাড়ে ব্যাথা, পেশীর দুর্বলতা সহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

যাদের প্রয়োজনের তুলনায় কম ওজন রয়েছে তাদের জন্য ওটমিল না খাওয়াই উত্তম। কারন এটি খাওয়ার পর খিদে কমে যায়। ফলে যারা ওজন বৃদ্ধির জন্য ডায়েট করছেন তাদের খাদ্য তালিকা থেকে Oats বা ওটমিল বাদ দেওয়া উচিৎ।

খাওয়ার নিয়ম ও রেসিপি

ওটমিল সাধারনত সকালে নাস্তায় খাওয়া হয়। দুধ, কেক, স্মুদি বিভিন্ন উপায়ে ওটমিল খাওয়া হয়। চলুন এ পর্যায়ে ওটস এর জনপ্রিয় ও স্বাস্থ্যকর রেসিপি জেনে নেওয়া যাক। যা আপনার সকালের নাস্তাকে আরও বেশি পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ করে তুলবে।

ওটস খিচুড়ি

ওটস খিচুড়ি বানাতে যে সকল উপকরন প্রয়োজন হব- ২ কাপ ওটস, হাফ কাপ মুগডাল বা মসূর ডাল, আধা কাপ গাজর কুচি, ১ থেকে ২ কাপ ব্রকলি, রসুন বাটা ১ চা চামচ, স্বাদমতো লবন, ১-২ টি কাঁচামরিচ, ১ কাপ টমেটো কুচি, আধা চা চামচ বা তার কম হলুদের গুঁড়া, ধনিয়া পাতা, ১ চা চামচ তেল। আপনি চাইলে গরম মসলা, জিরা গুঁড়া, মটরশুঁটি যোগ করতে পারেন।

যেভাবে ওটস খিচুড়ি রান্না করবেনঃ একটি প্যানে ওটস ও মুগডালগুলো সামান্য ভেজে নিন। আপনি চাইলে নাও ভাজতে পারেন তবে আমার মনে হয় একটু টেলে বা ভেঁজে নিজে স্বাদ একটু বেশি হয়। একটি প্যান বা কড়াইয়ে সামান্য তেল দিয়ে হলুদ, রসুন, আদা ও স্বাদ মতো লবন দিয়ে কষিয়ে নিন। এরপর ব্রকলি, টমেটো কুচি, গরম মসলা, গাজর, মটরশুঁটি দিয়ে ভালোভাবে নাড়ুন। এবার পরিমাণমতো কাঁচামরিচ, ধনেপাতা কুচি, ওটমিল ও পানি দিয়ে ঢেকে দিন। বাচ্চাদের জন্য পাতলা ওটমিল খিচুড়ি রান্না করতে চাইলে পানির পরিমাণ একটু বাড়িয়ে দিন। নিজের পছন্দমতো পাতলা বা ঘন হলে চুলা থেকে নামিয়ে ফেলুন।

ওভারনাইট ওটস

ওটসের এই রেসিপিটি আমার কাছে অনেক বেশি সহজ ও মজাদার মনে হয়েছে। ওভারনাইট ওটস বানানোর জন্য আপনার যেসকল উপকরণ প্রয়োজন হবে আগে চলুন সেগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক। ওটস-১ কাপ, ১ টেবিল চামচ টক দই, হাফ গ্লাস দুধ, ভ্যানিলা, পছন্দমতো ফল, চিয়া সিড। আপনি চাইলে বাদাম, কিচমিচ এগুলোও যোগ করতে পারেন।

সবগুলো উপকরণ একসাথে ব্লেন্ড করে একটি কাচের পাত্রে কয়েক ঘণ্টার জন্য ফ্রিজে রাখুন। সকালে এর সাথে পছন্দমতো ফলের টুকরো দিয়ে পরিবেশন করুন। আপনি চাইলে আমন্ডও মিশিয়ে নিতে পারেন।

বাংলাদেশে ওটস এর দাম

বাংলাদেশে এক কেজি রোলড ওটসের দাম ১০০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা।

কোথায় কিনতে পাওয়া যায়

বিভিন্ন অনলাইন শপ, মুদি দোকান ও সুপার শপে Oats কিনতে পাওয়া যায়।

ওটস কি থেকে তৈরি হয়

অনেকেই মনে করে ওটস গম থেকে তৈরি হয়। আসলে এটি ভুল ধারণা। ওটমিলটস গম থেকে তৈরি হয় না। ওটস তৈরি হয় অ্যাভেনা স্যাটিভা উদ্ভিদ থেকে, যা এক ধরনের শস্যদানা।

কোন কোম্পানির ওটস ভালো?

বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন কয়েকটি ভালো মানের কোম্পানি হচ্ছে- কোয়েকার, কাউহেড, ডাঃ গ্রাম, কেলগ, অ্যাভেনা ওটমিল, সাফোল্লা ওটমিল, বাচ্চাকাচ্চা ওটমিল , টুইনফিশ ওটমিল। জেনে রাখা ভালো অ্যাভেনা স্যাটিভা উদ্ভিদ বাংলাদেশে চাষ হয় না তাই এটি সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভরশীল পন্য। তাই কেনার আগে অবশ্যই স্বনামধন্য আমদানিকারক বা বিক্রেতার নিকট থেকে কিনুন। এছাড়াও সস্তা দাম দেখে নিম্ন মানের কিংবা নকল ওটমিল কেনা থেকে বিরত থাকুন।

সর্বশেষ

সম্মানিত পাঠক, ওটমিল নিয়ে আমাদের লেখা আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। আমাদের লেখা নিয়ে আপনার কোন মতামত কিংবা পরামর্শ থাকলে শেয়ার করতে পারেন আমাদের সাথে। ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন। নিয়মিত স্বাস্থ্য ও বিউটি টিপস পড়তে বা জানতে ভিজিট করুন আপনাদের প্রিয় ট্রেন্ড ও’ক্লক।

Scroll to Top