কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায়, খাবার, ব্যায়াম ও ওষুধ

আমাদের অনেকেই কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো বিরক্তকর ও যন্ত্রণাদায়ক সমস্যায় ভুগে থাকি। তবে এই কোষ্ঠ কাঠিন্য একদিনে বা হঠাৎ করে দেখা দেয় না। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পানিশূন্যতা, অপুষ্টিশ নানা কারনে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। আপনি জেনে অবাক হবে যে, ন্যাশনাল লাইব্রেরী অভ মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে প্রায় ৩০% মানুষ তাদের জীবদ্দশায় কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কি!

প্রিয় পাঠক, আজকের লেখাজুড়ে আমি আপনাদের সাথে আলোচনা করবো কোষ্ঠকাঠিন্য কি, উপসর্গ, কোষ্ঠকাঠিন্য হলে কি কি অসুবিধা হতে পারে, স্বল্প মেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ঘরোয়া উপায়, এবং বয়স্ক, শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার সিরাপ ও ওষুধের নাম।

কোষ্ঠকাঠিন্য কি?

সাধারন অর্থে কোষ্ঠকাঠিন্য (Constipation) হল এমন একটি অবস্থা যেখানে একজন ব্যক্তির অস্বস্তিকর বা কদাচিৎ মতলত্যাগ হয়। এটি একটি গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ব্যাধি। সহজ বাংলায়, কোষ্ঠকাঠিন্য হচ্ছে কঠিন আকারে মলত্যাগ করা। সাধারণত সপ্তাহে ২-৩ বার কিংবা তার কম বার মলত্যাগ হলে কিংবা অতিতিক্ত শুষ্ক বা শক্ত মলত্যাগ হয় তাহলে তাকে কোষ্ঠকাঠিন্য বলে। আর এই সমস্যা ৩ মাসের বেশি স্থায়ী হলে তাকে দীর্ঘমেয়াদি কোষ্ঠকাঠিন্য বলে।

কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়ার কারণ

বিভিন্ন কারনে কোষ্ঠকাঠিন্য বা স্বাভাবিক পায়খানা না হতে পারে। যেমন- পানিশূন্যতা, কম ফাইবারযুক্ত খাবার খাওয়া, মানসিক চাপ, পায়খানার বেগ আসলে চেপে রাখা অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা। এছাড়াও ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, খাদ্যাভ্যাস, বয়স, লিঙ্গ, স্বাস্থ্যের অবস্থাও মলত্যাগের অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্যের উপসর্গ বা লক্ষণ

কোষ্ঠকাঠিন্যের উপসর্গ বা লক্ষণগুলো হচ্ছে- মলত্যাগ করতে কষ্ট হওয়া, বেশ কয়েকদিন ধরে মলত্যাগ না করতে পারা, অতিরিক্ত শক্ত বা শুকনো ও চাকার মতো মলত্যাগ করা, পেট ফোলা, পেট ব্যাথা করা, ক্ষুধা কমে যাওয়া, অলসভাব।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ঘরোয়া উপায়

কোন প্রকার ওষুধ ছাড়াই সম্পূর্ণ ঘরোয়া উপায়ে আপনি কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি পেতে পারেন। ঘরোয়া উপায়ে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার বা পায়খানা ক্লিয়ার করার উপায়গুলো নিচে দেওয়া হল-

পর্যাপ্ত পরিমান পানি পান করুন

নিয়মিত পানিশূন্যতা পায়খানা ক্লিয়ার না হওয়ার বা কোষ্ঠকাঠিন্যের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আপনি যদি এমন কোন সমস্যায় ভুগে থাকেন তাহলে প্রথমেই আপনার পানি পানের পরিমান সঠিক আছে কিনা অর্থাৎ পরিমানমতো পানি পান করছেন কিনা সেদিকে নজর দিন। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের প্রতিদিন নুন্যতম ২ লিটার পানি পান করা উচিত। পানি আমাদের মলকে নরম করে, খাবার হজমে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

ফাইবারযুক্ত খাবার গ্রহন করুন

আমাদের দৈনন্দিন খাবার তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমান ফাইবার বা আঁশ জাতীয় খাবার না থাকা কোষ্ঠকাঠিন্যের অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে বাঁচতে প্রতিদিন নূন্যতম ৩০ গ্রাম ফাইবার খাওয়া উচিৎ। ফাইবার জাতীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে- আপেল, নাশপতি, পাকা কলা, পেঁপে, গাজর, ব্রকলি, শিম, ছোলা, মিষ্টি আলু, কচু শাঁক, কলমিশাঁক, চিয়া বিজ, লাল আটা ও লাল চাল, ওটস, মটরশুটি ইত্যাদি।
সতর্কতাঃ তবে খাদ্যতালিকায় হঠাৎ করে ফাইবার বাড়িয়ে দেওয়া উচিৎ না। পাশাপাশি পানি পান করার পরিমানও বাড়াতে হবে। কারণ ফাইবার জাতীয় খাবার খাওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান না করলে পেটের ভেতরে থাকা নাড়িভুঁড়ির মুখ আটকে যেতে পারে।

ব্যায়াম করুন

কোষ্ঠকাঠিন্য সারাতে ব্যায়াম করার কথা শুনে অবাক হলেন নাকি? শুধুমাত্র এই সমস্যা থেকে নয় আমাদের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিৎ। বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন অন্তন ৩০ মিনিট ব্যায়াম করার পরামর্শ দেয়।মলত্যাগের এই অস্বাভাবিক অবস্থা সারতে নিয়মিত কিছু ব্যায়াম করা উচিৎ যেমন- হাঁটা, সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো বা জগিং করা ইত্যাদি।

ইসবগুলের ভুসি সেবন করুন

ইসবগুলের ভুসির নানাবিধ উপকারিতা সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই জানা আছে। ইসবগুলের ভুসি আপনার মলকে নরম করতে দারুন সহায়ক। কারণ এতে প্রচুর পরিমাণ আঁশ রয়েছে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ও সকালে খালি পেটে ১ গ্লাস কুসুম গরম পানিতে ১ থেকে ২ চা চামচ পরিমাণ ইসবগুলের ভুসি সেবন করুন। এটি আপনার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে দারুন কাজ করবে। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে ইসবগুলের ভুসি প্রচুর পানি শোষণ করে তাই এটি খেলে আপনাকে প্রচুর পানি পান করতে হবে। অন্যথায় হিতের বিপরীত হতে পারে।

টক দই খান

টক দইয়ে প্রচুর পরিমাণ ল্যাটিক অ্যাসিড থাকে যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। নিয়মিত খাবার খাওয়ার পাশাপাশি ২ থেকে ৩ চা চামচ টক দই খাওয়ার চেষ্টা করুন। এটি আপনার পায়খানা ক্লিয়ার হতে সাহায্য করবে।

দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলা

আমরা জানি আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর মধ্য অন্যতম পুষ্টি উপাদান হচ্ছে আমিষ। আর আমিষের অন্যতম সেরা উৎস হল দুধ। তবে আপনার কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিলে দুধ বা দুগ্ধজাত পন্য খাবার হিসেবে গ্রহণ না করা উত্তম। কারণ দুগ্ধজাত খাবার গ্রহনের ফলে অন্ত্রের নড়াচড়ার উপর প্রভাব পড়ার কারনে মলত্যাগের এই অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্য হলে যে সকল খাবার খাওয়া যাবে না

আমরা ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি আমাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের খাদ্যাভ্যাস। কোষ্ঠকাঠিন্য হলে বা এ থেকে বাঁচতে চাইলে ভাজাপোড়া এবং তৈলাক্ত খাবার, হিমায়িত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার, লাল মাংস, পনির, ধূমপান থেকে বিরত থাকুন।

কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ?

কোষ্ঠকাঠিন্য কোন মারাত্নক ব্যাধি না। তবে এটি এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বা প্রায়শই হয়ে থাকলে এবং ঘরোয়া প্রতিকারেও উন্নতি না হলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। এছাড়াও অনেক সময় বিভিন্ন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকেও এটি হতে পারে। তাই আপনি যদি কোন ওষুধ গ্রহণ করে এবং এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয় তাহলে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

গর্ভবতী বা প্রেগন্যান্ট মহিলাদের কোষ্ঠকাঠিন্য হলে করনীয়

গর্ভবতী মায়েদের বিভিন্ন কারনে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে বেশি বেশি পানি করুন, একসাথে অতিরিক্ত খাবার গ্রহন না করে ছোট ছোট ভাগ করে খাবার গ্রহণ করুন, পায়খানা আসলে চেপে রাখা থেকে বিরত থাকুন, খাদ্য তালিকায় শাক-সবজি ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার যুক্ত করুন, নুন্যতম ৩০ মিনিট হাঁটাচলা করুন। তবে মলত্যাগ স্বাভাবিক না হলে কোন অবহেলা না করে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।

কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসা, ওষুধ ও সিরাপের নাম

বাল্ক ফমিং ল্যাক্সেটিভ, স্টিমুলান্ট ল্যাক্সেটিভ, ফেকাল সফটনার (Fecal Softener), অসমোটিক ল্যাক্সেটিভ, ডুলাক্স সিরাপ, অ্যাভোলাক সিরাপ।

দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ ব্যবহার করলে ইলেক্টালাইটস ইমব্যালেন্স হতে পারে এবং মারাত্মক পুষ্টিহীনতা দেখা দিতে পারে। তাই কোন দীর্ঘমেয়াদী ওষুধ গ্রহন করা উচিৎ না। যত সম্ভব ঘরোয়া উপায় অনুসরন করা।

বিঃ দ্রঃ প্রিয় পাঠক, এখানে দেওয়া ওষুধ শুধু মাত্র আপনাদের জানার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। আমরা এই ওষুধগুলো কেনা বা গ্রহনের জন্য পরামর্শ দিচ্ছি না। যে কোন প্রকার ওষুধ কেনা ও খাওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ব্যায়াম

পরিমাণমতো পানি পান করা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি নিয়মিত কিছু ব্যায়াম আপনাকে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি দিবে। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে যে সকল ব্যায়াম করা উচিৎ সেগুলো হচ্ছে- দৌড়ানো বা হালকা হাঁটাহাঁটি, জগিং, সাঁতার, সাইকেল চালানো ইত্যাদি। প্রতিদিন ৩০ মিনিট ব্যায়াম এটি দূর করার পাশাপাশি আপনাকে শারীরিকভাবে ফিট রাখবে।

সর্বশেষ

প্রিয় পাঠক, শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে আমাদের নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান, ঘুম ও ব্যায়্যাম নিশ্চিত করতে হবে।

আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। আমাদের লেখা নিয়ে কোন প্রশ্ন, মতামত কিংবা জিজ্ঞাসা থাকলে লিখতে পারেন আমাদের কাছে। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

Scroll to Top